আজ ৭ই জুন, বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ছয় দফা।

নিজেস্ব প্রতিবেদক, রুপসী বাংলা:

১৯৬৬ সালের এই দিনে বাঙালি স্বাধিকার ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে প্রাণ দেন তেজগাঁওয়ের মনু মিয়া, আবুল হোসেন ও আদমজীর মুজিবুল্লাহসহ ১১ জন শ্রমিক। প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়

আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন-একটি স্মরণীয় দিন, একটি মহান দিবস। বাঙালির স্বাধিকারের সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
ছয় দফা আন্দোলনের রক্তঝরা দিন। বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের এক গৌরবময় দৃষ্টান্ত। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বাঙালি স্বাধিকার ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে প্রাণ দেন তেজগাঁওয়ের মনু মিয়া, আবুল হোসেন ও আদমজীর মুজিবুল্লাহসহ ১১ জন শ্রমিক। প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। সেদিনের শহীদদের রক্তের পথ বেয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। এই আন্দোলনের সূত্র ধরে আসে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ‘৭১-এর মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন, ‘৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই সঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই রক্তঝরা দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য- পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্র। ৬ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে যে হরতাল-আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা নির্যাতন, গ্রেফতার ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ লাভ করে।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবিসমূহ

প্রথম দফা :

শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে।প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে।

দ্বিতীয় দফা :

কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ।অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

তৃতীয় দফা :

মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দু’টি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময়যোগ্য।এ ক্ষেত্রে দু’অঞ্চলে স্বতন্ত্র বা পৃথক পৃথক ষ্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রার পরিচালনা ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। অথবা, এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে।বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্থান থেকে পশ্চিম পাকিস্থানে মূলধন পাচার বন্ধ করার জন্য সংবিধানে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে

চতুর্থ দফা :

রাজস্ব কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: সকল প্রকার রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে।কেন্দ্রীয় তথা প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান আঞ্চলিক তহবিল হতে সরবরাহ করা হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই ফেডারেল তহবিলে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে যেন রাজস্বনীতির উপর নিয়ণ্ত্রন ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকে।

পঞ্চম দফা :

বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: পঞ্চম দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে নিম্নরূপ সাংবিধানিক বিধানের সুপারিশ করা হয়: (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারে থাকবে এবং অঙ্গরাজ্যের প্রয়েআজন অঙ্গরাজ্য কর্তৃক ব্যবহৃত হবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মতনির্দিষ্ট হারে অঙ্গরাজ্যগুলেআ মিটাবে। (ঘ) অঙ্গরাজ্যের মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে মুল্ক বা করজাতীয় কোন বাধা থাকবে না। (ঙ) সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্য প্রতিনিধি দল প্রেরণের এবং স্ব স্ব স্বার্থে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

ষষ্ঠ দফা :
আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: (ক) আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। (খ) কেন্দ্রীয় সরকারের সকল শাখায় বা চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিট থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করতে হবে। (গ) নৌ-বাহিনীর সদর দপ্তর করাচি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করতে হবে।

এদিকে দিনটিকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে পালনের উদ্দেশ্য আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের,দলের সকল নেতাকর্মীদের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন।

রুপসী বাংলা /৭ জুন/ পি এ / বি এস

Check Also

পহেলা বৈশাখ বাঙালীর উৎসবের দিন

[ শরীফুল ইসলাম ] বৈশাখ এলেই যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসে বাঙালিত্ব ভাব। বসন্তের ইতিহাস …

Powered by themekiller.com