“সুলতা বনাম বনলতা সেন”    একটি তুলনামূলক কাব্য বিশ্লেষণ       –ডঃ সৈয়দ এস আর কাশফি

 

কবি শফিকুল ইসলামের কবিতায় তার কাব্য প্রেয়সী সুলতার যে নান্দনিক ও শৈল্পিক সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায় তা সামগ্রিক ও কাব্যময়। কবি জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেনের মতো কোন খন্ড চিত্রকল্প নহে। বর্ণনা এখানে সফল, কাব্যময় এবং জীবন্ত। জীবনানন্দ দাস  বনলতা সেনের মুখশ্রী ও চুলে কাব্য সৌন্দর্য্য খোঁজে ফিরেছেন। যা নিতান্তই খন্ড চিত্র। যেমন তিনি বলেছেনঃ–

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”…

এখানে বনলতা সেনের সফল সৌন্দর্য বর্ণনা আমরা খোঁজে পাইনা। প্রায় অন্ধকারের মত তার চুল দেখার ঝাপসা আকুতি ও কাল্পনিক শ্রাবস্তীর মতো তার মুখের আদল। অন্যপক্ষে সুলতা প্রসঙ্গে কবি শফিকুল ইসলামের কাব্যময় উচ্চারণঃ–

“সুলতা, তুমি আমার

বাগানের মধ্যে সদ্য প্রস্ফুটিত

তাজা গোলাপ দেখার অনুভূতি।

………………………………….

সুলতা তুমি আমার আধার আকাশে

একটি চাঁদের মত-

একটি নিটোল নিভাজ স্বপ্নœ,

একটি সজীব কবিতা,

চির ঝংকৃত সুরে একটি ছন্দ দ্যোতনা,

শিল্পীর আকা যেন একটি জীবন্ত ছবি।”

[কবিতাঃ সুলতা তুমি আমার]

(শ্রাবণ দিনের কাব্য)

পাঠক মাত্রই জানেন সৌন্দর্য বর্ণনায় তাজা প্রস্ফুটিত গোলাপের উপমা একটি সফল উপমা। তাজা গোলাপ দেখার মতো রূপময় অনুভূতি পৃথিবীর আর কোন সুন্দর সৃষ্টিতে খুঁজে পাবেন না। একমাত্র প্রেয়সীর দৈহিক সৌন্দর্য ছাড়া। এখানে কবি শফিকুলের বর্ণনা তার কাব্য প্রেয়সী প্রস্ফুটিত তাজা গোলাপ দেখার অনুভূতি, যা সুন্দরতম সুন্দর। তার মনে কাব্য প্রেয়সী সুলতা তুলনাহীনা অপরূপা ও সৌন্দর্যময়তায় ভরপুর। কবির দৃষ্টিতে সুলতা তেমনি এক সুন্দরী প্রিয়তমা।

জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেনে সে রকম কোন জোরালো বর্ণনা আমরা খোঁজে পাই না। জীবনানন্দ দাস বনলতা সেনের মুখে দেখেছেন শ্রাবস্তীর কারুকার্য যা কাল্পনিক ও অনেকটাই পুরনো। অন্যপক্ষে কবি শফিকুল ইসলাম সুলতার মুখে এমন এক জ্যোতি  দেখেছেন যা প্রাণের কাছাকাছি, ভালবাসা মাখা ও কালোত্তীর্ণ। সে জন্যেই সে জ্যোতির অনুপস্থিতিতে কবি হয়েছেন আর্ত, বিমর্ষ ও ক্লান্ত। জীবনানন্দ দাস বনলতা সেনের মুখশ্রী দেখে ক্ষণিকের জন্য আমোদিত হলেও তা ছিল নিতান্তই ক্ষণিকের ভালবাসা। ভালবাসা নহে এবং প্রেম ও নহে। তাই সে মুখশ্রী দেখতে না পেলে কবির হৃদয়ের কি আকুতি বনলতা সেনে তা আমরা পাই না। কিন্তু কবি শফিকুল ইসলামের সফল কাব্য সুরঃ–

“সুলতা একদিন যে মুখে

এক অপার্থিব আলো দেখেছিলাম-

যে আলোর মোহে

পতঙ্গ আগুনের উত্তাপ ভুলে গিয়ে

ঝাপিয়ে পড়ে প্রাণ দেয়।

সুলতা সেই মুখে আজ

এ কোন কালো মেঘের ছায়া।”

[কবিতা : সুলতা একদিন যে মুখে]

(শ্রাবণ দিনের কাব্য)

হেলেন বিশ্বের সুন্দরী শ্রেষ্ঠা। তার সৌন্দর্য দেখে ট্রয় নগরীর বৃদ্ধরাও অভিভুত হয়ে যেত। সে নারী মাত্র নয়। সে অমর দেবীর অবিকল প্রতিমূর্তি।। হেলেন কাম সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যের প্রতীক। অন্যদিকে কবি শফিকুল ইসলামের সুলতা এক অপরূপা নারী মূর্তির প্রতীক যিনি দেবী না হয়েও কবির মনে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিতা। রক্ত মাংসের নারী হয়েও পূঁজার বিগ্রহ রূপে কবির মনকে করেছে আন্দোলিত। দিয়েছে প্রশান্তির অনাবিল ছোঁয়া। ক্ষণকালের জন্য নহে অনন্তকালের জন্য। তাই কবির সফল উচ্চারণঃ–

“তোমাকে বাদ দিলে

ভালো লাগার মত এই পৃথিবীতে

আমার আর কিছুই নেই”।

[কবিতা: সুলতা এই জীবনে]

(তবুও বৃষ্টি আসুক)

বনলতা সেনে কবি জীবনানন্দ দাস বনলতা সেনের অভাবে বিরহ যন্ত্রণার কোন সুর তোলেন নি। তার মানে বনলতা সেনকে কতটা ভালবাসেন বুঝা যায় না যদি ও আঁধারের সঙ্গিনী হিসেবে তার মনে পাওয়ার আকাঙ্খা অত্যন্ত প্রবল। এটাকে প্রেমের আকুতি বলা যায় না কিংবা ভালবাসার প্রার্থনাও বলা যায় না। এখানে কবি জীবনানন্দ দাসের চরম ব্যর্থতা।

কবি শফিকুল ইসলাম প্রেমের এক সফল কবি। তিনি অঝোর শ্রাবণ ধারায়, রিমঝিম বৃষ্টিতে, আলো আঁধারের কাব্যময় খেলায় ও চেতনার চন্দ্রিমায় তার কাব্য প্রেয়সী সুলতাকেই কি চান। তার কালোত্তীর্ণ সব কবিতাগুলোর পরতে পরতে, ছন্দে, উপমায় ও কাব্য অলংকারে সুলতার অপরূপ রূপের বর্ণনা প্রগাঢ় ও চিত্রময়। কবির মন সুলতাকে জগতের সকল উপমার উর্ধ্বে অন্য এক অনন্য উপমায় খুঁজে ফিরছেন। সেই জন্য দৃঢ় উচ্চারণঃ–

“তোমার উপমা শুধু তুমি

তুমি আছ সব সৌন্দর্যের মাঝখানে

সৌন্দর্যের রাণী হয়ে সগৌরবে মহিয়সী।”

[কবিতা : সুলতা যখন তোমায় দেখি]

( শ্রাবণ দিনের কাব্য)

কবি পুর্ণেন্দু পত্রী তার কাব্য-প্রেয়সী নন্দিনীর রূপে বিমোহিত হয়ে যেমন বলেছিলেনঃ–

“কেন্দ্রে আছ তোমাকেই

সূর্যরশ্মি আছে ঘিরে,

নন্দিনী পুরনো হলে

পৃথিবী পাবে শ্বাশ্বতীরে।”

তেমনি কবি শফিকুল ইসলামের কাব্য প্রেয়সী সুলতা ও অনন্ত মাধুরীময়, অপরূপা ও কাব্য মাধুর্যমন্ডিত যা কখনই পূর্ণ হবার নয়, হয় না। কবির মনে সে চিরদিনই সুলতা, চির যৌবনা সুলতা, চিরকাব্যময় সুলতা, হৃদয়ের সুলতা, প্রাণের সুলতা ও স্বপ্নের সুলতা এক কথায় ভালবাসার সুলতা। যা কবির মনে চিরদিনই প্রেমের পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে নিশিদিন। তাই কবির কাব্যময় উচ্চারণঃ–

“তোমার রূপের আলোয়

আমার বিশ্বভুবন উদ্ভাসিত–

তুমি ছাড়া আমার সবই অন্ধকার”।

[কবিতা : সুলতা যখন তোমায় দেখি]

( শ্রাবণ দিনের কাব্য)

অন্যদিকে কবি জীবনানন্দ দাস বনলতা সেনকে যদিও নাটোরে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন তবু সে তার চোখে অপরূপা ও তুলনাহীনা নহে। বিদিশা নগরীর শ্রাবস্তীর মতন এক নগ্ন নারী যা কেবল কামার্তরাই অন্ধকারে আকাঙ্খা করে থাকেন। কবিও তাই বলেছেন- এই আকাঙ্খা কখনও কাব্যিক নয় এবং শিল্পমাধুর্য বর্জিত। ভালবাসা না পাওয়ার স্বস্তিÍ তিনি বনলতা সেনের কাম-আবেদনময়ী নগ্ন দেহে খুঁজে ফিরেছেন দুদন্ডের প্রশান্তির জন্য, দুদন্ডের স্পর্শের জন্য। কবি জীবনানন্দ দাস বলেছেনঃ–

“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশিথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।”

(কবিতাঃ বনলতা সেন)

পাঠক, একটু মনযোগ দিয়ে খেয়াল করুন; কবি জীবনানন্দ দাস হাজার বছর ধরে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে পথ হেঁটেছেন কার জন্য? বনলতা সেনের জন্য? নাকি অন্য প্রেযসীর জন্য? যদি বনলতা সেনের জন্য হতো তাহলে সে তার অন্তরে চিরন্তন প্রেমের এক উজ্জ্বল উন্মাদনা ছড়িয়ে দিত যা হতো অনন্তকালের, দু-দন্ডের জন্য নয়। কারণ যাকে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে পেয়েছেন সে শুধু হবে দু-দন্ডের কামসঙ্গীনি কিংবা স্পর্শসঙ্গিনী অথবা শুধু সঙ্গিনী সে হতে পারে না। কারণ প্রগাঢ় ভালবাসায় যাকে পাওয়া যায় সে মনে চিরন্তন প্রেমের পরশ বুলিয়ে দেয় যা কোন প্রেমিক কখনই ভুলে যেতে পারে না। দু-দন্ড কেন হাজার বছরে ও যা ভুলে যাবার নয়।

সুতরাং একথা সু-স্পষ্ট যে বনলতা সেনকে তিনি কখনই খোঁজেন নাই। পথ হাঁটার ক্লান্তিময় মুহুর্তে দু-দন্ডের শান্তির জন্য ক্ষণকালের সঙ্গিনী করেছিলেন। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় কিভাবে বনলতা সেন কালোত্তীর্ণ কবিতা। অন্তত কবির ভাষ্যে সে দু-দন্ডের কামসঙ্গিনী কিংবা ক্লান্তিময় পথে পড়ে থাকা দু-দন্ডের স্পর্শসঙ্গিনী।

অন্যদিকে কবি শফিকুল ইসলাম সাফ সাফ বলে দিয়েছেন তিনি সুলতাকেই খুঁজছেন, সুলতার কাছেই যাবেন এবং চিরতরে তার কাছেই থেকে যাবেন, এমনকি কোনদিনই তাকে ছেড়ে যাবেন না।প্রেমের সফল কালোত্তীর্ণ উচ্চারণ এর চেয়ে আর কি বা হতে পারে। তার প্রেমময় উচ্চারণঃ

Check Also

কবি- রিতুনুর।

পৌষের শীতে হিমেল হাওয়ায় ঠান্ডায় কাঁপছে সারা দেশ লেপ কম্বল, কাঁথার ভিতরে সময় কাটে বেশ। …

Powered by themekiller.com