মুক্তিযুদ্ধের না ভোলা স্মৃতি

শেখ মামুনুল হক (শেখ মামুন)

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, বিজয় আমার প্রাপ্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমার পথ চলার সাথি। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ৫ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা তাঁদের প্রতি এবং হাজার বৎসরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আমার কিছ্ু উল্লেখযোগ্য স্মৃতিচারণ করছি যা আমার বাল্যকালের স্মৃতিতে এখনও গভীর দাগ কেটে আছে আমি মনে করি এই সব ঘটনা নতুন প্রজন্মের জানা উচিৎ।

সময়টি সম্ভবত ‘মে ১৯৭১’ সনের মাঝামাঝি একটি দিন ঐ দিন সকালে আমার সেঝো চাচা শেখ আলী আশরাফ লুলু (প্রায়ত) আমাদের বাড়ীর পিছনে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে একটি ছোট বিল (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মাজার কমপ্লেক্স এর মসজিদ ও এম পি থিয়েটার এবং ১নং গেট) সেখানে যাওয়ার পরে দূরে বিলের শেষ প্রান্তে তাকিয়ে দেখতে পান বাঘিয়া নদী দিয়ে পাকিস্তানী আর্মি ভর্তি গানবোট এবং লঞ্চ টুঙ্গিপাড়া গ্রামের দিকে আসছে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে উর্ধ্বশ^াসে দৌঁড়ে বাড়ীতে এসে সব ঘরে খবর দেন “মিলিটারী আসছে যে যেখানে পারো – পালাও” ওনার সংবাদের প্রেক্ষিতে আমাদের শেখ পরিবারের প্রতি ঘরের সদস্যরা আমাদের বাড়ীর পশ্চিম-উত্তর পাশ দিয়ে বহমান খালের ওপাড়ে গ্রামের মধ্যে বিভিন্ন বাড়ীতে ও বিলের মধ্যে আশ্রয় নেয়, সেই সময় বাড়ীর প্রতিটি ঘরে পারিবারের সদস্য ছাড়াও ঢাকা, খুলনার নিকট আত্মীয়-স্বজন ছিল। উল্লেখ্য তিনি যদি খবর টি না দিতেন তবে শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ও বিপদে আশ্রয় নেওয়া আত্মীয়-সাজনরা সেদিন নিহত হতেন ইতিমধ্যে পাকিস্তানি জানোয়ার মিলিটারীর দল দ্রæতগতিতে আমাদের শেখ বাড়ীতে প্রবেশ করে প্রতি ঘরে ঘরে তান্ডব চালায় এবং আগুন লাগিয়ে দেয় আর বৃদ্ধ মুরুব্বীদের যাদের সামনে পেয়েছে আমাদের কাচারী বাড়ীর উঠানে লাইন করে বসায়, কিছু পাকি আর্মি ও রাজাকার গ্রামে ঢুকে বাড়ী বাড়ী তল্লাসী করে যুবক ছেলেদের ধরে এনে ঐ স্থানে লাইন করে বসায় হত্যার উদ্দেশ্যে।

ইতিমধ্যে পাকিস্তানি জানোয়ার মিলিটারীর এক গ্রæপ বঙ্গবন্ধুর আব্বার ঘরে প্রবেশ করে, বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ আব্বা-আম্মাকে লাঞ্চিত অপদস্ত করে এবং ঘরের সমস্ত মূল্যবান জিনিষপত্র লুট করে ওদের লঞ্চে……….পাঠিয়ে দেয়। এখানে উল্লেখযোগ্য ২টি ঘটনা না বললেই নয় প্রথমত, বঙ্গবন্ধুর ঘরে ২টি ছবি ছিল যার একটি বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং অন্যটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের, ঐ পাকিস্তানী জানোয়ারেরা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবিটি ‘মালাউন কা বাচ্চা হ্যায়’ বলে গালি দিয়ে ভেঙ্গে বুট দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে আর বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিটি অত্যন্ত তাজিমের সাথে নামিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখে “ইয়ে সাচ্চা মুসলমান হ্যায়” বলে। বাড়ীর সবাই পালিয়ে গেলেও আরশাদ মিয়া ভাই বঙ্গবন্ধুর আব্বা-আম্মাকে রেখে পালায় নাই, তিনি বঙ্গবন্ধুর আব্বা-আম্মার সাথেই ছিলেন, তিনি ওনাদের ধরাধরি করে বাড়ীর উঠানে নিয়ে যান এবং ২টি চেয়ার যোগাড় করে ওনাদের নিরাপদ জায়গায় বসান।

ইতিমধ্যে পাকিস্তানি মিলিটারীরা গান পাউডার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আব্বার ঐতিহাসিক সৌখিন কারুকার্যময় টিনের ঘরটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর আব্বার ঐ টিনের ঘরটি আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সৌখিন টিনের বাংলো টাইপের বাড়ী ছিলো যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো বঙ্গবন্ধুর আব্বা খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন, তিনি বার্মা থেকে সেগুন কাঠ আর কোলকাতা থেকে মিস্ত্রী এনে বৃটিশ আমলে ঐ দর্শনীয় বাড়ীটি তৈরী করেন। বঙ্গবন্ধুর আব্বা-আম্মাকে সেবা করার অপরাধে এবং বঙ্গবন্ধুর আব্বা-আম্মার চাচাতো ভাই এবং তৎকালীন এমএনএ শেখ মোশারফ হোসেন খান সাহেবের খোঁজ না দেওয়ার কারনে আরশাদ ভাইকে পাকিস্তানি জানোয়াররা বুট দিয়ে পিষে হত্যা করে শহীদ আরশাদ ভাই বঙ্গবন্ধুর আব্বা-আম্মাকে রেখে পালিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেন নাই, শহীদ আরশাদ হচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে টুঙ্গিপাড়ার প্রথম শহীদ।

ইতিমধ্যে আমাদের কাচারী বাড়ীর উঠানে লাইন করা মানুষদের মধ্যে থেকে ৬ জন’কে আলাদা করে পাকি জানোয়ারেরা বাবা-ভাই-স্বজনের সামনে পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে এবং আরশাদ ভাইয়ের মত তাদেরও বুট দিয়ে পিষে হত্যা করে তাদের মধ্যে শহীদ কাজী তোরাব আলী ইন্টারমিডিয়েট ও মিন্টু শেখ অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন (পিতার সামনে পুত্রদের হত্যার কারণে তোরাব আলী ও মিন্টুর পিতা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং কিছুদিন পরে অকালে মৃত্যুবরণ করেন)।

আমরা ইতিমধ্যে দূরের গ্রাম থেকে দেখতে পাই, আমাদের টুঙ্গিপাড়া শেখবাড়ী দাউ দাউ করে জ¦লছে পাকিস্তানি জানোয়াররা আমাদের বাড়ী লুট করে মূল্যবান সামগ্রী ওদের লঞ্চে তোলে এবং যাদের মাথায় করে ঐ মালপত্রগুলো লঞ্চে নেয় যাওয়ার সময় তাদের পারিশ্রমিক হিসাবে গুলি করে হত্যা করে নদী ঘাটে ফেলে যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হাবল নামে এক কিশোর ও ধলা মিয়া।………… ইতিমধ্যে সকাল গড়িয়ে দুপুর-বিকাল আমরা সারাদিন অভুক্ত যে দরিদ্র কৃষকের বাড়ীতে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম সন্ধ্যার আগে সে কিছু আলু সিদ্ধ করে দেয় আমাদের খাওয়ার জন্য ঐ সিদ্ধ আলু খেয়ে আমরা সেই কৃষকের বাড়ীতে খেজুর পাতার পাটি মাটিতে বিছিয়ে পোকা-মাকড়ের সাথে রাত্রি যাপন করি।

এদিকে দুপুর নাগাদ পাকিস্তানি জানোয়ার মিলিটারীরা তান্ডব চালিয়ে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করে সন্ধ্যার আগে আমার দুই চাচা শেখ আকরাম হোসেন (জগন্নাথ কলেজের সাবেক জি এস) এবং শেখ কবীর হোসেন (খান সাহেবের জেষ্ঠ্যপুত্র এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক চেয়ারম্যান) তারা সাহস করে বাড়ীতে আসেন এবং টুঙ্গিপাড়ার শহীদদের লাশগুলি রাতের মধ্যেই নিজ হাতে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন যা বিরল এক মানবতার দৃষ্টান্ত।

জুন মাসের আট তারিখে আমার খালু শহীদ নওশের আলী চৌধুরী পাকিস্তানি জানোয়ারদের হাতে নির্মমভাবে গ্রামের বাড়ীতে শহীদ হন সেদিন ওনাকে হত্যা করতে গিয়ে পশ্চিম গোপালগঞ্জের পাইককান্দি গ্রামে পাকিস্তানি জানোয়ারেরা তান্ডব চালায়। আমার খালু তৎকালীন সময়ে খুলনা শহরে বাঙ্গালীদের মধ্যে বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি ছিলেন এবং বাঙ্গালীদের মধ্যে প্রথম বার্জ লঞ্চের মালিক ছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু এবং গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর স্কুল সহপাঠী ছিলেন তার অপরাধ তিনি আওয়ামী লীগ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা দিতেন ওনাকে হত্যা করতে গিয়ে ওনার বাড়ীতে বহু মানুষকে হত্যা করে এবং ফিরে যাওয়ার সময় ঐ এলাকায় মোট ৫৭ জন নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করে এমনকি পাকিস্তানি জানোয়ারদের ভয়ে গর্ভবতী মহিলারা পাট খেতে আশ্রয় নিয়ে ছিল ওরা তাদের ধরে এনে বেওনেট দিয়ে পেট চিরে দেখেছে, পেটের বাচ্চাটি ছেলে না মেয়ে।

পশ্চিম গোপালগঞ্জের এই ভয়াবহ ঘটনার পরে আমার বাবা মরহুম আলহাজ¦ শেখ মোহাম্মদ আলী আমার খালার পরিবারের সাথে দেখা করতে টুঙ্গিপাড়া থেকে পাইককান্দি গ্রামে যান বিশ^স্ত সঙ্গী কাশেম মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে, টুংগীপাড়া ফেরার পথে গোপালগঞ্জের কাছে পাকিস্তানি জানোয়ারদের হাতে ধরা পড়েন প্রথমে ওরা আমার বাবাকে গোপালগঞ্জে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায় সেই সময় শেখ পরিবারের যে কয়জনের নামে প্রথম শ্রেণীর হুলিয়া ছিলো তার মধ্যে আমার বাবা ছিলেন অন্যতম একজন জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তৎকালীন ক্যাম্প কমান্ডার মেজর আমার বাবাকে বাচার জন্য একটি সুযোগ দেয় তা হল আমার দাদার ফুপাতো ভাই শেখ মোসারফ হোসেন খান সাহেব তৎকালীন এমএনএ তিনি কোথায় লুকিয়ে আছেন তাকে ধরিয়ে দিতে হবে বঙ্গবন্ধুর একমাত্র……… ভায়রা শেখ মোহাম্মদ মুছা বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাছেরসহ শেখ পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় লুকিয়ে আছে তাদেরকে ধরিয়ে দিতে হবে শেখ পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে শেখ কামাল, শেখ মণি, শেখ শহিদ কোন পথে ভারতে গিয়েছে সেই রুট ম্যাপ দিতে হবে এবং পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা হিসাবে তাকে চাকুরীতে যোগদান করতে হবে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে এই শর্তগুলি পূরণ করতে হবে অন্যথায় তাকে কি করা হবে এই বলে ওদের টর্চারসেলে নিয়ে যায় সেখানে আমার বাবার সামনে গত রাতে ধরা পড়া ২ জন মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে আহত অবস্থায় আনা হয় প্রথমে তাদের ২ জনকে পা উপরে দিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে একটি কুয়ার উপরে ঝোলানো হয় এবং ২টি উত্তপ্ত লোহার শিক ঐ দুই মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের চোখের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ করে এবং বলতে থাকে, তুমি যদি আমার কথা না শোন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতে যাও তোমাকে ধরে এনে এই হাল করবো তোমাদের টুঙ্গিপাড়ার বাড়ী এবার মাটির সাথে মিশিয়ে দিব এবং পরিবারের যে যেখানে আছে হুলিয় জারী করে ধরে এনে হত্যা করবো মনে রেখো তোমার নির্যাতন হবে এর চেয়েও কঠিন। এই রকম ভয়াবহ নির্যাতন করতে করতে ঐ দুই মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে এক সময় কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয় ইতিমধ্যে আমার বাবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, ওনার জ্ঞান ফেরার পরে ঐ কুক্ষ্যাত মেজর তার স্বহস্তে লিখিত অঙ্গিকার নামা’য় সহি করিয়ে তিন দিনের সময় দিয়ে সাময়িক মুক্তি দেয় এবং নৌকায় টুঙ্গিপাড়া পাঁঠায় সে সময় নৌকায় গোপালগঞ্জ থেকে টুঙ্গিপাড়া যেতে ৫/৬ ঘন্টা সময় লাগত, পথিমধ্যে আমার বাবা আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, আব্বার বিশ^স্ত সঙ্গী কাসেম মোল্লা ভাই মাথায় পানি দিতে দিতে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে আসে। টুঙ্গিপাড়া আসার পরে বিধ্বস্ত বাবাকে দেখে বুঝতে পারি পাকিস্তানি জানোয়ারদের দ্বারা তার কি হাল হয়েছে।

আব্বা ধাতস্থ হয়ে উপস্থিত মুরুব্বীদের সাথে আলাপ করে তার কি করা উচিৎ, আমার দাদা পরামর্শ দেন খান সাহেবের সাথে দেখা করে ঘটনা জানাও টুঙ্গিপাড়ার পূর্বদিকের বিশাল বিলের মধ্যে আত্মগোপনে থাকা আমার পরিবারের বিশেষ মুরুব্বী এবং আব্বার চাচা শেখ মোসারফ হোসেন খান সাহেব দাদা, আব্বাকে সিদ্ধান্ত দেন যে তিনি মালেক নামক একজন লোক দিবে সে আজ রাতেই আব্বাকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং মালেক ভাই আব্বাকে ভারতে রেখে টুঙ্গিপাড়া ফিরে আসলে আমরা খান সাহেব দাদার সাথে ভারতে রওনা হব।

আব্বা ভারতে রওনা হওয়ার পরেই টুঙ্গিপাড়া শেখ পরিবারের যারা বাড়ীতে ছিলেন সবাই আবার বাড়ী ছাড়া হয় কারণ ঐ মেজর ৩দিন পরে টুঙ্গিপাড়া ধ্বংস করতে আসবে আল্লাহর বিচার, ৩দিন পরে ঐ মেজর টুঙ্গিপাড়া আসার পূর্বে কোটালীপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বাহিনীর দ্বারা আক্রমণের স্বীকার হয় এবং বহু পাকি জানোয়ার মিলিটারীসহ করুণভাবে নিহত হয়।……..আমরা ঐ সময় দিনের পর দিন বাগেরহাটের ফকির হাট, সাহেবার, মোল্লার হাট, চিতলমারী, ধোপাখালী ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় আতœগোপন করে থাকি ইতিমধ্যে নতুন আরো একটি দুঃসংবাদ যুক্ত হয়, আমার ছোট খালু মাদারীপুরের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ আবদুল লতিফ খান শিবচরের টিপু ডাক্তার নামে সর্বাধিক পরিচিত তাঁর বাড়ী পাকি জানোয়াররা আক্রমণ করে লন্ডভন্ড করেছে এবং খালুকে ধরে নিয়ে গেছে তার খবর নাই। কিছুদিন পরে আমার দাদা ডাঃ শেখ মাহ্ফুজুল হক, বাগেরহাটের সাহেবার গ্রামে কাসেম মোল্লা ভাইকে পাঠান আমাদের টুংগীপাড়া নিয়ে আসার জন্য কারণ আব্বাকে ইতিমধ্যে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দিয়ে মালেক ভাই ফিরেছেন আরো জানতে পারলাম আব্বা শেখ মোহাম্মদ আলী সাহেব মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছেন এবং তিনি বিভিন্ন শরনার্থী ক্যাম্পে রিলিফ ও তাবু বিতরণ করার দায়িত্ব পেয়েছেন এতো বিপদের মধ্যে এটাই প্রথম শুখবর পেলাম যাইহোক, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের নিয়ে খান সাহেব শেখ মোসারফ হোসেন দাদা তার পরিবারসহ দ্রæত ভারতে রওনা হবেন। ইতিমধ্যে তিনি পরিবারসহ গোপনে গোপালগঞ্জের রামদিয়ায় তার মেঝ জামাতা রামদিয়া কলেজের অধ্যক্ষ আইয়ুবুর রহমান সাহেবের বাড়ীতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

বাগেরহাট থেকে ফেরার পরেরদিন আমরা টুঙ্গিপাড়া থেকে মালেক ভাই এর সাথে আমার ছোট চাচা শেখ মির্জা সহ (বর্তমানে মেয়র টুংগীপাড়া পৌরসভা) নৌকায় ভারতের উদ্দেশ্যে রামদিয়ার পথে যাত্রা করি ২ দিন পরে রামদিয়ায় পৌঁছি। রামদিয়ায় গিয়ে দেখি আমাদের ফুপা আইয়ূব সাহেবের বাড়ী-ঘর পাকি জানোয়ার ও রাজাকারেরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতির পরে খান সাহেব দাদা ও তার পরিবারের সাথে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সম্বল করে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি পথিমধ্যে অনেক বাধা-বিপত্তি ঝড়-ঝাপটা, বিপদ-আপদ, অথৈই বিলের মধ্যে নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া, ডাকাতের কবলে পড়া,পাকি আর্মির হাতে ধরা পড়ে বেঁচে যাওয়া ইত্যাদি ঘটনাবহুল কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে রক্ষা পেয়ে ২০-২২ দিন পরে এক কাপড়ে আল্লাহ্র অশেষ রহমতে আমরা সবাই কলিকাতায় পৌঁছতে সমর্থ হই।

শেখ মামুনুল হক (শেখ মামুন)
শেখবাড়ী, টুংগীপাড়া, গোপালগঞ্জ

Check Also

পহেলা বৈশাখ বাঙালীর উৎসবের দিন

[ শরীফুল ইসলাম ] বৈশাখ এলেই যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসে বাঙালিত্ব ভাব। বসন্তের ইতিহাস …

Powered by themekiller.com