পহেলা বৈশাখ বাঙালীর উৎসবের দিন

[ শরীফুল ইসলাম ]

বৈশাখ এলেই যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসে বাঙালিত্ব ভাব। বসন্তের ইতিহাস রক্ষা করে ঝরাপাতার দিন। তখন ফাগুন শেষ। চৈত্রসংক্রান্তির মেলার পরের দিন পহেলা বৈশাখ। বৈশাখারে দিনটিতে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি বাঙালি খাবার এবং গ্রাম বাংলার পোশাকে। তাহলে কি আমরা শুধু পহেলা বৈশাখের জন্য এক দিনের ভাঙালির ভাব ধরি। আমরা কি ভুলে যাই বাঙালির শেকড় যে আবহমান বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আসলে তা কিন্তু নয় আধুনিকতার ছোঁয়া যতই বাঙালিকে স্পর্শ করুক না কেন, একজন বাঙালি যে মনেপ্রাণে বাঙালি এবং একসময় যে তাকে শেকড়ে ফিরে যেতে হবেই এ বোধ বাঙালির মধ্যে উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠে লুকায়িত ভাবে।
তাই দোকানে ধূপ জ্বালানো হয়েছে। হালখাতা,টালিখাতায় লাল দাগ তুলে পাশের ওপারে লাল কাপড় মুড়িয়ে কালো জাম, পিঠা আর দৈ-পরোটার আয়োজন করা হয়েছে। দোকানের পরিবেশও চুনকাম করা। বিছানায় গোলাপজল, মাথার ওপরের সাইনবোর্ডে নতুন কালিতে তকতকা রেখা আর গনেশের ছবির ওপর লাল-শাদা কাগজের মালা; সামনের মাটিরঙা জায়গাটুকুতে ঝাঁটার কোপানির ঠকঠকা প্রদর্শনী। সেটার যতœ-আত্তি সারা বছর যাই হোক, এই পহেলা বৈশাখে একদম একশ’ ভাগ। বাকিতে আজ হবে না। বাকির শোধ নিয়ে সব বাঙালির আজ এই একটি দিন। এ নিয়ে অপেক্ষা বা তিষ্ঠানোও কম নয়। এখন তো আর গ্রাম-শহর তেমন আলাদা করা যায় না। পরিবর্তন হয়েছে কত কী! বয়ে এনেছে কত রকমের মূল্যবোধ। তা ঠিক, সময় তো একরকম থাকে না, সমাজ-সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-জীবনাচরণ পাল্টায়, বিবর্তনের ধারাস্রোতে তাতে নানারকম রঙ পড়ে। পরিবর্তনের শলাকায় সৃষ্টি ও সৌন্দর্য স্বীয় স্বভাব পায়।
উৎসব চিরচেনা থাকে না, গ্রহণ-বর্জনের সূত্রে কিছু বিকার-আকারও চোখে পড়ে, প্রজন্মের হাত ধরে তা আসে, গড়িয়ে চলে, গৃহীতও হয়। কিন্তু সর্বসাকুল্যে এখনও পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব, সোজা করে বলি- আমাদের উৎসব। তাকে আমাদের করে এখনও পাওয়া যায়। লাল-শাদা-নীলের মিলন ও মুক্তির হাওয়ায় দুলে ওঠা- ওই একটি দিনই আমাদের। তা নিয়ে আল্লাদ আছে। বুঝি মনে-প্রাণে আমরা চাই, ওটা সৃষ্টিশীল থাক- আমাদের মতো হোক, পাছে কোনো কর্পোরেট কেউ যাতে ওকে ছিনতাই না করে! সেই ধক মাখা আশংকা কোথাও মিললে কিছুই তো বলারও থাকে না- কিন্তু কেন আমরা এটাকে আমাদের করে রাখব চিরকাল, সে পরিচিতিটুকু তো নবপ্রজন্মের কাছে রাখা চাই। তাদের চলার পথটুকু তো আমাদেরই দেখানো পথ!
সারাদেশে লোকে লোকারণ্যে এক যোগে বৈশাখী উৎসব উৎযাপন করে। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে এত উচ্ছলতা উচ্ছাস, প্রাণের জোয়ার সত্যিকার অর্থেই মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি।
এর মধ্যে লক্ষণীয় একাটা বিষয়, বৈশাখের প্রথম দিনের দাবদাহকে উপেক্ষা করে ছেলে-বুড়ো-শিশু, তরুণ-তরুণী সবাই যোগ দেন বর্ষবরণের নানা অনুষ্ঠানে। কাশি, বাঁশি, ঢোল, সারিন্দা, একতারা ইত্যাদি বাংলার লোকায়ত বাদ্যযন্ত্রের সুর বেজেছে সর্বত্র। পাশাপাশি বর্ষবরণের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ তো আছেই। এ যেন এক মোহনীয় তারুণ্যদীপ্ত পরিবেশ। নতুন পোশাকে বাঙালি মাতোয়ারা হয়েছে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। তবে অস্বীকারের উপায় নেই, বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এখন অনেকাংশে দখল করে নিয়েছে মর্ডান।
এমন অবস্থায় সারা বছর বাঙালি সংস্কৃৃতিকে মনে প্রানে ধারণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমরা মুখে বাঙালি সংস্কৃৃতিচর্চার কথা বলতে অভ্যস্ত কিন্তু কাজেকর্মে তার উল্টো প্রমাণ দিয়ে থাকি। আমরা যাঁরা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতি জাহির করি, তারাও কিন্তু বাঙালি আচরণ দেকাই না। জীবনাচরণেও বাঙালিপনা ফুটে ওঠে না। ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াই। যার কারিকুলামে বাঙালি, বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের কোনো গন্ধ থাকে না। এ ধরনের স্ববিরোধী সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে কি আমরা খুব বেশিদূর এগোতে পারব ? ফলে বাংলা নববর্ষ পালনে যতই উচ্ছাস থাকুক না কেন, অজ্ঞতাও যে একেবারে নেই তা হলফ করে বলা যায় না। উৎসবমুখর বাঙালি জীবনযাপনের নানা সংকট আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে নানা সাজে নানা বৈচিত্রে উৎসব-আনন্দে মেতে উঠলেও অজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ কিংবা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বিষয়ক শিক্ষার বিষয়টিকেও আরো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।
সংস্কৃতি নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়ে প্রবহমান থাকে। আমরা যা ভাবছি, পছন্দ করছি এবং যা প্রতিদিনের জীবনাচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে তা-ই আমাদের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানে নিজস্বতা নিয়ে সুন্দরভাবে বিচিত্র পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকা। সংস্কৃতি মানে কেবল নাচ, গান, সিনেমা কিংবা নাটক নয়। বাঙালি যদি তার নিজস্বতা হারিয়ে বিদেশি সংস্কৃতিকে বুকে ও মনে ধারণ করে সারা বছর কাটিয়ে দিতে পারে তা হলে একটি দিনের বাঙালি হয়ে, পহেলা বৈশাখ পালন করা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এজন্য শুধু উৎসব নয়, উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে অবগত করানো জরুরি। বিশ্বের অনেক ঐতিহ্য ও সভ্যতা কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুতরাং বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিও যে একদিন চর্চা ও রক্ষার অভাবে কালের অতলে হারিয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়।
এই তো বৈশাখ! একে আরও অভিপ্রেত করার উদ্দেশ্য ও উপায় বের করা চাই, প্রতি বছর উদ্যাপনের ভেতর দিয়ে। যেমনটা এখনও মনে হচ্ছে- এই বৈশাখও পাল্টেছে, স্বভাবমতো- নব প্রজন্মের উদ্যাপনের কারণে। তবে পহেলা বৈশাখকে স্বভাবমতো নিজের রঙে তৈরি হতে হবে, চিরচাঞ্চল্যমাখা অনুভবে রাঙানো চাই। কিন্তু কীভাবে? সবার একীভূত করার মধ্য দিয়ে। এ একীভূতকরণ কাউকে পৃথক যেন না করে, অভেদ না থাকে, অনৈক্যের বিপরীতে ঐক্য সুদৃঢ় করে, স্বাস্থ্যবান সম্পর্ক রচনা করে, নবীন-প্রবীণ, কেন্দ্র-প্রান্ত, শাদা-কালো, উঁচু-নিচু পার্থক্য না করে- এক কাতারে সকাতরে তুলে আনে। ভাগ নয়, অনন্য একক। বৈশাখ সেই উদযাপনকে নতুন করে শেখার, দাঁড়াক ভেদের বিপক্ষে, পার্থক্যের বিরুদ্ধে; ঐক্যের জন্য প্রতিবছর বৈশাখ নতুনরূপে নিজেকে তুলে ধরুক, এগিয়ে নিক, গতি দিক, স্বাধীন এই বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে স্মারকরূপে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুক।
বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রবহমান রয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় এটা মনে করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে যে, এ প্রতিকূল পরিবেশের অন্যতম হচ্ছে আকাশ সংস্কৃতি। আকাশ সংস্কৃতির দৌরাত্ম্য এত বেশি যে, একে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। তবে উপেক্ষা এক বিষয় আর মনেপ্রাণে গ্রহণ অন্য ব্যাপার। কোনটা গ্রহণযোগ্য আর কোনটা বর্জনযোগ্য সে বিবেচনাবোধ আমাদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতা ও রুচির। নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা আমাদের সেই শিক্ষা দিতে পারে। বাঙালির ঐতিহ্য ও কৃষ্টি সম্পর্কে উৎকৃষ্ট চিন্তা এবং কাজের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হলেই বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সার্থকতা আমাদের মাঝে ফুটে উঠবে। তাই উল্লাসে ফেটে পড়–ক, দিকপ্লাবী হোক। চলুক ভোজবাজি। নিজের মতো তা বাঁকও ফেরাক। কারো কাছে স্বীয় স্বভাবকে তুলে দেয়া নয়, আমাদের নববর্ষ থাক আমাদের।
লেখক পরিচিতি : শরীফুল ইসলাম। সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার-দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ, চাঁদপুর টাইমস, রূপসী বাংলা, বার্তা সম্পাদক নতুনের ডাক।

Check Also

পুলিশ যেখানে জনগনের সেবক!

Powered by themekiller.com